Skip to main content

চেতনা সিনহা: ব্যাংক গড়ে যিনি বদলে দিয়েছেন ভারতের গ্রামীণ নারীদের ভাগ্য

আজ আমরা বলব এমন একজন নারীর কথা, যিনি দেশের গ্রামীণ নারীদের কঠোর পরিশ্রম করে গড়ে তোলা উদ্যোগকে দিয়েছেন এক অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সাফল্যের রূপ। তিনি চেতনা সিনহা- নানা অসুবিধার মধ্যেও গ্রামের নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করতে যিনি নানা ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়ে তাদের জীবনে এনেছেন এক সত্যিকার বদল।
চেতনাদেবী ১৯৯৭ সালে মহারাষ্ট্রের মাসোয়াদে তৈরি করেন তার 'মান দেশি' ব্যাংক, যার মুখ্য উদ্দেশ্য শুধুমাত্র গ্রামীণ নারীদের ঋণ দেওয়া নয়, তাদের সুবিধা অনুযায়ী সেই ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করাও। ব্যবসায়িক উদ্যোগের ন্যূনতম চাহিদাটুকু মেটাতেও গ্রামের নারীদের ঋণ দিয়ে থাকে চেতনা সিনহার ‘মান দেশি' আর্থিক সংস্থা। লক্ষ্য একটাই: ভারতের গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন।
ঠিকা শ্রমিক, পশুপালন বা চায়ের দোকান দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা নারী- সবার পাশেই দাঁড়িয়েছে চেতনা দেবীর 'মান দেশি' ব্যাংক। মহারাষ্ট্র এবং কর্ণাটক রাজ্যে আটটি শাখা এবং ১৪০ জন ফ্যাসিলিটেটর-এর মাধ্যমে তিন লক্ষেরও বেশি বেশি নারীর কাছে আজ পৌঁছে গিয়েছে 'মান দেশি'।


মান দেশি শুধুমাত্র একটি ব্যাংক নয়। এই সকল নারীর চাহিদা মিটিয়ে তাদের ক্ষমতায়ন এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটানোও আমাদের লক্ষ্য।
তিন লক্ষেরও বেশি বেশি নারীর কাছে আজ পৌঁছে গিয়েছে 'মান দেশি'; Imager Source: Changemakers
ঊনষাট বছর বয়সী চেতনার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা মুম্বাই শহরে। পড়াশোনা মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে। সত্তর ও আশির দশকে বড় হয়ে ওঠা চেতনাদেবী একসময়ে আকৃষ্ট ছিলেন জয়প্রকাশ নারায়ণের সাম্যবাদী রাজনীতির প্রতি; তাই বরাবরই তার সমাজসেবার দিকে ঝোঁক। তার অক্লান্ত সমাজসেবার জন্যে চেতনাদেবী আজ দেশ-বিদেশে এক বহু প্রশংসিত ব্যক্তিত্ব। পেয়েছেন নানা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এবছরের গোড়ায় সুইজারল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামেও তিনি আমন্ত্রিত হন।
শহুরে জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে চেতনা পশ্চিম মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ এলাকায় কৃষিকাজে মনোনিবেশ করতে গিয়ে রুক্ষ বাস্তবিক সমস্যার সঙ্গে পরিচিত হন। আর্থিক সমস্যা তো বটেই, দেখেন গ্রামের নারীদের উদ্যোগের ন্যূনতম সম্মানটুকুও কেউ দেয় না। তখনই তিনি ঠিক করেন কিছু একটা করে এর বিহিত করবেন।

কিন্তু ঠিক কী ঘটনা থেকে তার 'মান দেশি' তৈরি করার অনুপ্রেরণা এল?

শোনা যাক চেতনাদেবীর ভাষাতেই,
আমার কাছে একবার একটি গ্রামের নারী এসেছিল পরামর্শ চাইতে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার জন্যে। নারীটি ঠিক সাহায্য চাইতে আসেনি; তার প্রধান লক্ষ্য ছিল পয়সা জমা করে নিজের পরিবারের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। তখনই দৈনিক মজদুরি করা এই সমস্ত নারীদের প্রয়োজন মেটাতে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার কথাটা আমার মনে জাগে।
তবে এমনিতেই চেতনাদেবীর মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়নি। প্রথমে তিনি লাইসেন্সই পাননি সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এমন সংস্থা খোলার জন্য, কারণ, যাদের তার ব্যাংক ঋণ দেবে, তাদের বেশিরভাগই অশিক্ষিত। প্রথমে তিনি একটু মুষড়ে পড়লেও গ্রামের নারীরাই তাকে ভরসা যোগায় তার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে। এমনকি, তারা চেতনাদেবীকে অনুরোধ করেন তাদেরকে শিক্ষিত করে তোলার জন্যও। অবশেষে সদিচ্ছার জয় হয় এবং সকলের মিলিত প্রয়াসে তৈরি হয় চেতনা সিনহার অনন্য 'মান দেশি' ব্যাংক। লক্ষ ছয়েক টাকার পুঁজি দিয়ে শুরু হওয়া 'মান দেশি'র পথ এবং আকাঙ্ক্ষা আজ ঊর্ধ্বমুখী- নিরন্তর তার প্রয়াস সমাজের পিছিয়ে পড়া নারীদের হিতসাধনে।
স্বল্পমেয়াদি অথবা দীর্ঘমেয়াদি; এমনকি মাত্র ৫,০০০ টাকার ঋণও আজ দিয়ে থাকে 'মান দেশি' ব্যাংক এবং পরিশোধের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের সুবিধাকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে এই ব্যাংক। গয়না গচ্ছিত রেখেও এই নারী ক্রেতারা এই ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে পারেন।
চেতনাদেবী এটাও মাথায় রেখেছেন যে, দৈনন্দিন শ্রমে যাদের জীবনযাপন, তাদের যেন ব্যাংকে টাকা জমা রাখার কারণে একটি দিনও নষ্ট না হয় কারণ একটি দিনের আয়ও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। "এমন নারীদের কথা মাথায় রেখে আমরা ঠিক করেছি তারা নিজেরা যদি ব্যাংকে আসতে না পারেন, ব্যাংকই তাদের কাছে যাবে পরিষেবা দিতে," বললেন বিভিন্ন পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট এই সমাজকর্মী।
জীবনের নানা লড়াইতে জয় পাওয়া নাছোড়বান্দা এই সমাজকর্মীর কথায়,
জীবনে জেতার জন্যে পাঁচটি উপাদান খুব প্রয়োজনীয়: কাজের প্রতি আবেগ, ধৈর্য, অধ্যাবসায়, শোনার ইচ্ছে এবং নম্রতা।
চেতনাদেবীর মনে করেন,
একজন নারীর দায়িত্ব তার নিজের জন্যে এবং পরিবারের জন্যে কিছু করেই শেষ হয়ে যায় না। আমরা নারীকে অনুপ্রেরণা দেই সমাজের বদলের কাজে এগিয়ে আসার জন্য। আমরা অনেকটাই পথ পেরিয়েছি কিন্তু আরও পথ পেরোনো বাকি।
'মান দেশি'র উদ্যোগে আজ বহু গ্রামীণ নারী, যারা আগে পরিশ্রম করলেও আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগতেন, আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন, স্বনির্ভর হয়েছেন। তাদের জীবনে এই বড় পরিবর্তনের কৃতিত্ব যদি কেউ পেয়ে থাকেন, তবে তিনি চেতনা সিনহা এবং তার বৈপ্লবিক 'মান দেশি' ব্যাংক।
ইউএন উইমেন-এর পূর্ণ সহযোগিতায়  এম জি মোটর ইন্ডিয়া এবং  দ্য বেটার ইন্ডিয়া ভারতের সেই সমস্ত কৃতী নারীদের সম্মান জানাচ্ছে যারা প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে বিশ্বের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে দেশকে এক সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
**লেখাটি সৌজন্যে: রোর বাংলা
*** সমস্ত কৃতিত্ব প্রদানে : রোর বাংলা 

Comments

Popular posts from this blog

কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসে শর্ট প্রশ্ন

১   ) হিট্রো - গ্রাফি   কথার   অর্থ   কি                                                                         উত্তরঃইতিহাস   চর্চা ২ )  ইতিহাসের   জনক কাকে বলে                                                                        উত্তরঃহেরোডোটাস ...

আদি সমাজতন্ত্র বাদী বা কাল্পনিক সমাজতন্ত্র লেখক- সুমন্ত ঘোষ

সমাজতন্ত্রবাদ একটি বিশেষ অর্থনৈতিক মতবাদ শিল্প বিপ্লবের প্রসারের সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে কয়েকজন খ্যাতনামা সমাজতান্ত্রিক এর আবির্ভাব হয় । এই সমস্ত সমাজতান্ত্রিক কল্পনা করেছিলেন এমন এক সমাজ ব্যবস্থার যেখানে সকলেই নিজ নিজ যোগ্যতা অনুসারে কাজ করবে এবং সকলের শ্রম থেকে পাওয়া আয় সকলের মধ্যে ন্যায্যভাবে বন্টন করা হবে। মূলত এই মতবাদ প্রচলিত গণতন্ত্রবাদের মূলে কুঠারাঘাত করে যৌথ বা সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এর ভিত্তিতে নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পথ নির্দেশ করে সেটাই সমাজতন্ত্রবাদ । সমাজতন্ত্রবাদীদের মধ্যে তত্ত্বগত মতভেদ আছে। মাক্স পূর্ববর্তী সমাজতন্ত্রবাদীদের আদি সমাজতন্ত্র বাদী বলা হয়। যাদের utopian বা অবাস্তব আদর্শবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই আদি সমাজতন্ত্রবাদীদের মধ্যে একজন ছিলেন ইংল্যান্ডের রবার্ট ওয়েন। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন ম্যানচেস্টারের একটি কাপড়ের কলের ম্যানেজার। ম্যানেজার হিসেবে তিনি যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেন। কিন্তু factory প্রথার যাবতীয় কুফল দেখে তিনি শ্রমিকশ্রেণীর উন্নতি সাধনে তার জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। নিউ ল্যানার্কে একটি আদর্শ শিল্পনগর স্থাপন করে শ্রমিক সাধারণের সর্বপ্রক...

সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ ~অতীত-বর্তমান [লেখক: মিল্টন বিশ্বাস]

সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ গোষ্ঠীর ইতিহাস গবেষণার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। ২০১২ সালে এ গোষ্ঠীর প্রকাশনা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ আর বের হবে না। তিন দশক ধরে কাজ করার পর এ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেওয়া উচিত মনে করেছেন প্রধান তাত্ত্বিকরা। প্রত্যেকে এখন তাঁদের নিজের মতো করে কাজ করছেন। নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চায় সাহিত্য, দর্শন, ন্যায়শাস্ত্র, ধর্ম, বর্ণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। অর্থাত্ নিম্নবর্গের ইতিহাস কোনো একক অথবা পৃথক জ্ঞানকাণ্ড নয়। বিশ্বব্যাপী এ জ্ঞানকাণ্ডের প্রভাব এখনো বহাল। ল্যাটিন আমেরিকাতে সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা হচ্ছে। সেখানে সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত। জাপানেও বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় বেশিরভাগ গ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ায় ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়াতে এ গোষ্ঠীর লেখকদের নাম প্রায়ই উচ্চারিত হয়ে থাকে। মূলত দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসতত্ত্ব বিশ্বজয় করেছে ‘সাব-অল্টার্ন স্টাডিজ’ প্রকাশনার মধ্য দিয়ে। নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার এই গবেষণা-প্রকাশনার ইতিহাস বলার আগে এ গোষ্ঠী কর্তৃক ব্যবহূত ‘...